দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে করছাড়ের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রুফটপ সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ, জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন এবং বিদ্যুতের চাহিদা ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কৌশলপত্র প্রণয়ন করছে সরকার। এই কৌশলপত্রের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং এ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছে দেওয়া। লক্ষ্য অর্জনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কর-সুবিধা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের খসড়া ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে আরও ১০ থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে। খসড়া অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি-সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য উৎস থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠকে কৌশলপত্রের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতি বছর গড়ে ৬ শতাংশ হারে বাড়লে ২০৩০ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। সেই চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহ করতে হলে অন্তত ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। এ কারণেই নতুন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খসড়া কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) সংশোধন করে বিভিন্ন ধরনের ভবনের উপযোগী ছাদের ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ অংশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে চলমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পের ভবন, গ্যারেজ, সেতু, টার্মিনাল এবং অন্যান্য উপযোগী সরকারি অবকাঠামোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে কৌশলপত্রে। সেখানে বলা হয়েছে, কৃষিজমি ব্যবহার যতটা সম্ভব সীমিত রাখতে হবে এবং জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত প্রভাব ও মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, সৌরচালিত সেচ পাম্প এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামোকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া কৌশলপত্র অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হলে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গ্রিড আধুনিকায়ন অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদনের ওঠানামা সামাল দিতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হবে। কিছু ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলকও করা হতে পারে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য পৃথক ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল’ গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের সদস্য আশরাফুল আলম বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে কর-সুবিধা দিয়েছে। আগে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে তুলনামূলক বেশি কর থাকলেও এখন তা কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের আশা, করছাড়ের ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আরও বাড়বে এবং রুফটপ সোলারের বিস্তার ত্বরান্বিত হবে।
এদিকে রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সোমবার ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে ২১ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার কোনো ধরনের ব্যবসা বা বিনিয়োগে সরাসরি যুক্ত থাকবে না, এমনকি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পেও নয়। সরকারি অর্থে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে মূলধনী বিনিয়োগ না করে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার সুপারিশ করেন তিনি।
ক্যাবের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে এবং দরপত্রে সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য বা বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এই মূল্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব স্রেডা থেকে বিইআরসিতে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোকে গ্রিডে সরবরাহযোগ্য সব সৌরবিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করতে হবে। তবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়াতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট বিতরণ নেটওয়ার্কের মধ্যেই ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পতিত ও অনুৎপাদনশীল সরকারি জমি বিনা মূল্যে ইউটিলিটি স্কেলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের সুযোগ, মাঠপর্যায়ের মনিটরিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পৃক্ত করা, বিদ্যালয়ের মাধ্যমে অনলাইন মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, সব বিনিয়োগকারীর জন্য সমান আর্থিক প্রণোদনা, বিদেশি ঋণ ও অনুদানের ওপর অতিরিক্ত সুদ বা সেবামূল্য না নেওয়া, কার্বন ক্রেডিটের অর্থকে ভোক্তার বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা এবং ভোক্তাদের বিদ্যুতের মূল্য পরিবর্তনের আবেদন করার অধিকার দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
ক্যাব আরও প্রস্তাব করেছে, কৌশলপত্রে ‘জ্বালানি অধিকার’-এর আইনি স্বীকৃতি স্পষ্ট করতে হবে এবং বিইআরসি আইন সংস্কারের মাধ্যমে কমিশনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পকে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া, জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ খাতে অপচয় বা অনিয়মের মাধ্যমে হওয়া বিনিয়োগকে ‘খারাপ বিনিয়োগ’ হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। কৌশলপত্র চূড়ান্ত করার আগে সাশ্রয়ী মূল্য কাঠামো, আইনি প্রতিকারের সুযোগ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) স্বাধীনতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে শতভাগ বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
সংলাপে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গৃহীত অধিকাংশ প্রকল্পে জনকল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতি গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সেই সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায় এখন বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর বর্তেছে।
মন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। পাশাপাশি, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আরও দক্ষ, টেকসই ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের নানাবিধ উদ্যোগের কথা জানান।
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সৃষ্ট আর্থিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের দায়দেনা কাটিয়ে উঠতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। তবে এ লক্ষ্যে কোনোভাবেই উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় বা উৎপাদন করে তার অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। কৃষিজমি নষ্ট করে কোনো প্রকল্প করা হবে না; পতিত জমি ব্যবহার করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে, তাও উচ্চমূল্যে। আর্থিক অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করে গেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার; এজন্য বর্তমান সরকারকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
পূর্ববর্তী সময়ে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তির কারণে সরকারকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। বিগত সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে গেছে। সেই বকেয়ার পাশাপাশি একই সঙ্গে নতুন দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। এ জন্য প্রতি মাসে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি হলে জ্বালানি আমদানি খরচ কমবে।
কেকে/এলএ